হিসাবের ডেবিট-ক্রেডিট ও জাবেদা নির্ণয়

0
599

লেনদেন যেকোন ব্যবসায়ের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়। অর্থাৎ লেনদেনের ফলে ব্যবসায়ে অর্থের প্রাপ্তি যেমন ঘটতে পারে ঠিক একইভাবে প্রদানও ঘটতে পারে। এক্ষেত্রে অর্থের প্রাপ্তি ঘটলে তা আমরা আয় হিসেবে এবং অর্থের প্রদান ঘটলে তা আমরা ব্যয় হিসেবে বিবেচিত করি। ব্যবসায়ে কোন কোন লেনদেন যেমন আয় ও ব্যয়ের সৃষ্টি করে ঠিক তেমনি এমন কিছু লেনদেন থাকে যার ফলে দায় ও সম্পদের সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ সকল লেনদেনের ফলে কখনো সম্পদ ও দায়ের পরিমাণ বাড়ে আবার কখনো কমে। লেনদনের মাধ্যমে সম্পদ ও দায় অর্জিত হলে সম্পদ ও দায়ের পরিমাণ বাড়ে আর সম্পদ ও দায়ের পরিমাণ হ্রাস পেলে নিট সম্পদ ও দায়ের পরিমাণ কমে যায়।

যেকোন ব্যবসায়ের ঘটিনাসমূহ থেকে সর্বপ্রথম লেনদেনগুলোকে চিহ্নিত করা হয় তারপর পরবর্তীতে সেগুলো হিসাবের প্রাথমিক বই বা জাবেদায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়। জাবেদা বোঝার জন্য সর্বপ্রথম আমাদের হিসাব সম্পর্কে জানতে  হবে। অর্থাৎ হিসাব সম্পর্কে ভালো ধারনার মাধ্যমেই জাবেদা সহজেই নির্নয় করা যায়।জাবেদার আগে হিসাবসমূহের ডেবিট ও ক্রেডিট খুবই গুরুত্পূর্ণ। হিসাবসমুহের ডেবিট ক্রেডিটের জের জাবেদার দাখিলার জের নির্নয়ে সহায়তা করে।

জাবেদা ও হিসাবের ডেবিট-ক্রেডিট পরিচিতি

জাবেদাঃ ব্যবসায়ে বিভিন্ন ধরণের লেনদেন সংঘটিত হয়ে থাকে। লেনদেনগুলোকে চিহ্নিত করে হিসাবের যে প্রাথমিক বইতে লিপিবদ্ধ করা হয় তাকেই জাবেদা বলে।

তাই আমাদের সর্বপ্রথম হিসাব সম্পর্কে আলোচনা করতে হবে। জাবেদা প্রস্তুতের আগে হিসাব সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক-

হিসাবঃ ব্যবসায়ের বিভিন্ন লেনদেনে বিভিন্ন হিসাব জড়িত থাকে। লেনদেনের মাধ্যমে সকল প্রকার সম্পদ, দায়, আয়, ব্যয় ও মালিকানা স্বত্ব হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। এই সকল যাবতীয় হিসাবসমুহকে বাছাই করে সেগুলোর ডেবিট ক্রেডিট নির্ণয় করতে হয়। 

মনে রাখবেঃ সকল প্রকার সম্পদ ও ব্যয় হিসাবসমূহ ডেবিট হয় এবং সকল প্রকার আয় ও দায় হিসাবসমূহ ক্রেডিট হয়। অর্থাৎ সম্পদ ও ব্যয়ের স্বাভাবিক জের ডেবিট হয় এবং দায় ও আয়ের স্বাভাবিক জের ক্রেডিট হয়। আরেকটু বিস্তারিতভাবে বললে সম্পদ ও ব্যয়ের পরিমান বৃদ্ধি পেলে ডেবিট হয় এবং আয় ও দায়ের পরিমান বৃদ্ধি পেলে ক্রেডিট হয়। কিন্তু এগুলো ব্যতিক্রম ঘটলেই বিপরীত জের হয়। অর্থাৎ যদি কখনো সম্পদ ও ব্যয়ের পরিমান কমে যায় বা হ্রাস পায় তবে সম্পদ ও  ব্যয় তখন ডেবিট না হয়ে ক্রেডিট হয়ে যাবে। আবার যদি একইভাবে দায় ও আয়ের পরিমান কমে যায় বা হ্রাস পায় তাহলে তখন আর ঐ সকল হিসাবসমূহ ক্রেডিট না হয়ে ডেবিট হয়ে যাবে।

এখন কিছু হিসাব দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। হিসাবগুলোকে আমরা সাধারনভাবেই চিন্তা করব। যেমনঃ ক্রয় হিসাব, বিক্রয় হিসাব, আসবাবপত্র হিসাব, বিজ্ঞাপন হিসাব, বেতন হিসাব, দেনাদার হিসাব, পাওনাদার হিসাব, মজুদ পণ্য হিসাব, নগদান হিসাব,অবচয় হিসাব, মনিহারি হিসাব, পরিবহণ হিসাব, অফিস সাপ্লাইজ হিসাব, যন্ত্রপাতি হিসাব, উপভাড়া হিসাব, প্রাপ্ত কমিশন হিসাব, ঋণ হিসাব ইত্যাদি।

কোন হিসাবমূহের স্বাভাবিক জের কোনটি এবং কেন হবে?

এই সকল হিসাবগুলোর স্বাভাবিক জেরগুলো হবে

১. ক্রয় হিসাবডেবিট-কারন, ক্রয় একটি খরচ বা ব্যয় হিসাব এর ফলে নগদ টাকা চলে যায় আর এর জন্যই ক্রয় হিসাবের স্বাভাবিক জের ডেবিট হয়। 

২. আসবাবপত্র হিসাবডেবিট – আসবাবপত্র একটি সম্পদ হিসাব এর ফলে ব্যবসায়ে বা ব্যক্তিগতভাবে সম্পদের পরিমান বাড়ে। আর তাই আসবাবপত্র হিসাব সম্পদ হওয়ায় ডেবিট জের প্রদর্শন করে।

৩. বিজ্ঞাপন হিসাবডেবিট – বিজ্ঞাপন একটি খরচ হিসাব। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে যেহেতু নগদ অর্থ চলে যায় তাই এটি একোটি ব্যয় হিসাবের সৃষ্টি করে আর আতাই বিজ্ঞাপন হিসাবটি স্বাভাবিকভাবে ডেবিট জের প্রদর্শন করে।

৪. বেতন হিসাবডেবিট – বেতন হিসাব একটি ব্যয় বা খরচ হিসাবের নাম। বেতনের ফলে নগদ নামক অর্থের পরিমান কমে যায় যার ফলে ব্যয়ের সৃষ্টি করে। আর তাই বেতন হিসাবটি স্বাভাবিকভাবে ডেবিট জের প্রদর্শন করে।

৫. দেনাদার হিসাবডেবিট – দেনাদার হিসাব একটি সম্পদ হিসাব। দেনাদারের নিকট হতে নগদ অর্থের প্রাপ্তি ঘটে বিধায় নগদ অর্থকে সম্পদ বিবেচনায় দেনাদারকে সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করা হর। আর তাই দেনাদার সম্পদ হিসাব হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে ডেবিট জের প্রদর্শন করে।

৬. পাওনাদার হিসাবক্রেডিট – পাওনাদার একটি দায়বাচক হিসাব। পাওনাদের সঠিক অর্থ হুল, কোন ব্যক্তি আমার নিকট অর্থ দাবি করা। পাওনাদারকে অর্থ পরিশোধ করতে হবে এই চিন্তা থেকে নিজের উপর একটি দায়ের চিন্তার সৃষ্টি হয়। আর তাই পাওনাদারকে দায় হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। আর তাই পাওনাদার স্বাভাবিকভাবে ক্রেডিট জের প্রদর্শন করে।

উচ্চশিক্ষার গ্রহণের জন্য বিদেশে যাওয়ার পূর্ব প্রস্তুতি ও করণীয়

৭. মজুদ পণ্য হিসাবডেবিট – মজুদ পন্য একটি সম্পদ হিসাব। মজুদ পণ্য বলতে ব্যবসায়ে বিদ্যমান অর্থাৎ মজুদ করে রাখা পন্যের পরিমানকে বোঝানো হয়। এর ফলে যেহেতু সংরক্ষিত পণ্য দীর্ঘদিন পর্যন্ত ব্যবহার করা হয় বা বছর শেষে পরবর্তী বছরে আবার তা ব্যবহার করা হয়। আর তাই তাই এই দিক থেকে চিন্তা করে মজুদ পণ্যকে সম্পদ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। যেহেতু এটি একটি সম্পদ হিসাব বলে বিবেচিত তাই স্বাভাবিকভাবে এটি ডেবিট জের প্রদর্শন করে।  

৮. নগদান হিসাবডেবিট – নগদান হিসাব একটি সম্পদ হিসাব। নগদান হিসাবকে সব সময় সম্পদ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। এজন্য স্বাভাবিকভাবে এটি ডেবিট জের প্রদর্শন করে।

৯. অবচয় হিসাবডেবিট – অবচয় হিসাব একটি ব্যয় বা খরচ হিসাব। কোন সম্পতির ব্যবহারের ফলের সম্পত্তির যে মুল্য বার্ষিক হারে কমে বা হ্রাস পায় তাকেই অবচয় বলে। এর ফলে সম্পত্তির পরিমান কমে বিধায় অবচয় হিসাবটি স্বাভাবিকভাবে ডেবিট জের প্রদর্শন করে।

১০. মনিহারি হিসাবডেবিট – মনিহারি হিসাব একটি ব্যয় হিসাব। প্রতিষ্ঠানের জন্য যদি পেন্সিল, রাবার, কলম ইত্যাদি ক্রয় হয় সেগুলোর সমষ্টিকে মনিহারি বলা হয়। অর্থাৎ রাবার , পেন্সিল, কলম নামে ব্যবসায়ে কোন হিসাব অন্তর্ভুক্ত করা হয় না সেগুলকে মনিহারি হিসাব নামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মনিহারী হিসাবটি খরচ হিসাব হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে এটি ডেবিট জের প্রদর্শন করে।

১১. পরিবহণ হিসাবডেবিট – পরিবহণ একটি ব্যয় হিসাব। এর ফলে নগদ অর্থ চলে যায় তাই স্বাভাবিকভাবেই এই হিসাবটি ডেবিট জের প্রদর্শন করে।

বিসিএস পরীক্ষা সম্পর্কিত নতুনদের জন্য সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

১২. অফিস সাপ্লাইজ হিসাবডেবিট – অফিস সাপ্লাইজ হিসাব একটি সম্পদ হিসাব। প্রতিষ্ঠানের জন্য যেসকল ছোট ছোট সম্পদ ক্রয় করা হয় যা দীর্ঘদিন পর্যন্ত ব্যবহার করা যায় তাই অফিস সাপ্লাইজ। এক্ষেত্রে যে সকল সম্পদ ক্রয় করা হয় হিসাব সেগুলোর নামে সৃষ্টি হয় না মনিহারীর মত সমষ্টিগত নাম অর্থাৎ অফিস সাপ্লাইজ নামে সৃষ্টি হয়। যেমনঃ অফিসের জন্য পাঞ্চ মেশিন ক্রয় এক্ষেত্রে পাঞ্চ মেশিন নামে হিসাবের সৃষ্টি হবে না এক্ষেত্রে অফিস সাপ্লাইজ নামে হিসাবের সৃষ্টি হবে। যেহেতু অফিস সাপ্লাইজ একটি সম্পদ হিসাব তাই এটিও স্বাভাবিকভাবে ডেবিট জের প্রদর্শন করে।

১৩. যন্ত্রপাতি হিসাবডেবিট – যন্ত্রপাতি একটি সম্পদ হিসাব এর ফলে ব্যবসায়ে বা ব্যক্তিগতভাবে সম্পদের পরিমান বাড়ে। আর তাই যন্ত্রপাতি হিসাব সম্পদ হওয়ায় ডেবিট জের প্রদর্শন করে।

১৪. উপভাড়া হিসাবডেবিট – উপভাড়া একটি আয়। উপভাড়ার ফলে নগদ টাকা বৃদ্ধি পায় যার কারনে এটি একটি আয়বাচক হিসাবে চিহ্নিত হয়। উপভাড়া স্বাভাবিকভাবে ক্রেডিট জের প্রদর্শন করে।

১৫. প্রাপ্ত কমিশন হিসাবক্রেডিট – প্রাপ্ত কমিশন একটি আয়বাচক হিসাব। এর ফলে কমিশন পাওয়া যায় তাই এটি আয় হিসাব বিধায় হিসাবটি স্বাভাবিকভাবে ক্রেডিট জের প্রদর্শন করে।

১৬. ঋণ হিসাবক্রেডিট – ঋণ একটি দায়বাচক হিসাব। ঋণ নেওয়ার ফলের নিজের কাছে বা প্রতিষ্ঠানের দায়ের পরিমান বৃদ্ধি পায় বা নতুন করে দায়ের সৃষ্টি হয় তাই ঋণ হিসাবকে দায় চিহ্নিত করা হয়। ঋণ হিসবা দায় হিসাব হওয়ায় এটি স্বাভাবিকভাবে ক্রেডিট জের প্রদর্শন করে।

ব্যাখ্যাসহ কিছু লেনদেনের জাবেদা দাখিলা প্রস্তুতকরণ

১। নগদে পণ্য ক্রয় করা হল ২০০০ টাকা।

ক্রয় হিসাব – ডেবিট – ২০০০

নগদান হিসাব – ক্রেডিট – ২০০০

ব্যাখ্যাঃ এখানে নগদে পণ্য ক্রয়ের ফলে ক্রয় নামক ব্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে বা ব্যয়ের পরিমান বৃদ্ধি পেয়েছে তাই ক্রয় হিসাবকে ডেবিট করা হয়েছে। অপরদিকে নগদ অর্থ হ্রাস পেয়েছে তাই নগদান নামক সম্পদের পরিমান কমেছে তাই নগদান হিসাব ক্রেডিট হয়েছে। কারন আমরা জানি, সম্পদ কমে গেলে ক্রেডিট হয়ে যায়।

২। আসবাবপত্র ক্রয় করা হল ২০০০০ টাকা।

আসবাবপত্র হিসাব – ডেবিট – ২০০০০

নগদান হিসাব – ক্রেডিট – ২০০০০

ব্যাখ্যাঃ এই লেনদেনে ক্রয় ও আসবাবপত্র দুটি হিসাব বিদ্যামান ডেবিট হওয়ার জন্য কিন্তু এক্ষেত্রে আসবাবপত্র হিসাবকে ডেবিট করতে হবে। তার কারন হল, সম্পদ ক্রয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা অর্থে বোঝালে ব্যয় হিসাব অন্তর্ভুক্ত হয় না। তখন সম্পদ হিসাবকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আর তাইও এইখানে আসবাবপত্র হিসাবকে ডেবিট করা হয়েছে। অপরদিকে আসবাবপত্র ক্রয় করতে গিয়ে নগদ অর্থের পরিমান গ্রাস পাওয়ায় নগদান নামক সম্পদের পরিমাণ কমেছে আর তাই নগদান হিসাব ক্রেডিট হয়েছে।

৩। অফিসের জন্য আলপিন ক্রয় করা হল ১০০ টাকা।

মনিহারি হিসাব – ডেবিট – ১০০

নগদান হিসাব – ক্রেডিট – ১০০

ব্যাখ্যাঃ এই লেনদেনের ক্ষেত্রে আলপিন নামে কোন হিসাব অন্তর্ভুক্ত হবে না এক্ষেত্রে মনিহারী নামে অন্তর্ভুক্ত হবে। মনিহারী হিসাব কখন সৃষ্টি হবে তা আমরা উপরে জেনেছি। মনিহারি ক্রয়ের ফলে মনিহারি ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনিহারি হিসাব ডেবিট হবে। অপরদিকে, মনিহারি ক্রয়ের ফলে নগদ অর্থের পরিমাণ কমেছে। যার ফলে নগদান নামক সম্পদের পরিমাণও হ্রাস পেয়েছে তাই নগদান হিসাব ক্রেডিট হয়েছে।আশা করি এখন তোমরা এইরকম আরো জাবেদা নির্নয় করতে পারবে।

আমাদের সাথে যুক্ত হতে চাইলৈ : ফেসবুক পেইজ | | ফেসবুক গ্রুপ

উপরোক্ত তথ্য সম্পর্কিত কোন মতামত জানাতে চাইলে কমেন্ট করুন এবং শেয়ার করে অন্যকে জানার সুযোগ করে দিন

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন